সঞ্জিত চন্দ্র শীল, হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলায় যোগদানের মাত্র এক মাস ১১ দিনের মধ্যেই জনসেবামূলক নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়াচ্ছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেকসোনা খাতুন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সাধারণ মানুষের নাগরিক ভোগান্তি কমানো, প্রশাসনিক সেবাকে আরও সহজ ও জনবান্ধব করা এবং দীর্ঘদিনের স্থানীয় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তিনি। তাঁর কর্মতৎপরতা ও বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপে হোসেনপুরের সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই উপজেলার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া, সাধারণ মানুষের সমস্যা শোনা এবং সেসব সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে গুরুত্ব দিচ্ছেন ইউএনও রেকসোনা খাতুন। বিশেষ করে উপজেলার প্রত্যন্ত ইউনিয়নগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা, পৌর এলাকার পরিচ্ছন্নতা, বাজারের শৃঙ্খলা, যানজট নিরসন এবং জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে তাঁর বিভিন্ন উদ্যোগ ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে।
পৌর প্রশাসকের দায়িত্বেও সক্রিয় ভূমিকা
উল্লেখ্য, হোসেনপুর পৌরসভার পৌর প্রশাসকের পদটি শূন্য থাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেকসোনা খাতুন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পৌর প্রশাসকের দায়িত্বও পালন করছেন। ফলে উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত দায়িত্বের পাশাপাশি পৌর এলাকার নাগরিক সেবা ও বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের বিষয়টিও তাঁকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হচ্ছে।
পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনার স্তূপ অপসারণ এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে তিনি উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। পাশাপাশি পৌর এলাকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে ডাস্টবিন স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে যত্রতত্র ময়লা ফেলা বন্ধ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং পরিচ্ছন্ন পৌরসভা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চলছে। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে পৌর এলাকার পরিবেশ আরও সুন্দর ও স্বাস্থ্যসম্মত হয়ে উঠবে।
কাঁচা রাস্তা সংস্কার ও যোগাযোগব্যবস্থায় নজর হোসেনপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামীণ কাঁচা রাস্তার বেহাল অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের অন্যতম কারণ। বর্ষা মৌসুমে এসব সড়কে চলাচল করতে গিয়ে শিক্ষার্থী, কৃষক, রোগী ও সাধারণ মানুষকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন ইউনিয়নের যোগাযোগব্যবস্থার সমস্যা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে গুরুত্ব দিচ্ছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
গ্রামীণ সড়কের উন্নয়ন ও সংস্কারের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ করার প্রত্যাশা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ জনপদের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
হোসেনপুর বাজারে ভেজাল ও মানহীন পণ্য বিক্রি প্রতিরোধ এবং ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন ইউএনও রেকসোনা খাতুন। বাজারের বিভিন্ন দোকানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা ও জরিমানার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনার বিষয়ে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যেও স্বস্তি ফিরে আসছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারে নিয়মিত তদারকি, পণ্যের মান যাচাই এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে প্রশাসনের এমন কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে অসাধু ব্যবসায়ীদের অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
জমিজমার বিরোধে প্রকৃত মালিকদের স্বার্থ রক্ষায় উদ্যোগ এলাকায় জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ ও অবৈধ দখলের অভিযোগ দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। এসব ঘটনায় অনেক সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হয় এবং নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হতে হয়। এ ধরনের সমস্যায় প্রকৃত মালিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং প্রচলিত আইন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জমিসংক্রান্ত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে আইনানুগ সমাধানের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে ভুক্তভোগী মানুষের মধ্যে প্রশাসনের প্রতি আস্থা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
হোসেনপুর বাজারের দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় সমস্যা যানজট। বাজারের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলোতে যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ, যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করানো এবং শৃঙ্খলাহীন চলাচলের কারণে প্রতিদিনই সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বিশেষ করে বাজারের ব্যস্ত সময়ে যানজটের কারণে শিক্ষার্থী, রোগী, পথচারী ও ব্যবসায়ীদের চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে।
এ সমস্যা নিরসনে বাজারের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও পয়েন্টগুলোতে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য আনসার সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মাধ্যমে যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং যানজট কমানোর চেষ্টা চলছে।
স্থানীয়দের মতে, নিয়মিত তদারকি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে বাজারের যানজট পরিস্থিতির আরও উন্নতি সম্ভব।
সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডেও সম্পৃক্ততা
একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ করছেন রেকসোনা খাতুন। মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর অংশগ্রহণ স্থানীয় পর্যায়ে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, তাঁদের সমস্যা সম্পর্কে অবগত হওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রদানের মানসিকতাকে স্থানীয়রা একজন জনবান্ধব কর্মকর্তার ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখছেন।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেকসোনা খাতুন বলেন- জনসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া, নাগরিক ভোগান্তি কমানো, পৌর এলাকার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, যানজট নিরসন, বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং উপজেলার সার্বিক উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করছেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, হোসেনপুরবাসীর প্রত্যাশা—অব্যাহত থাকুক জনসেবার এই ধারা হোসেনপুরের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, যোগদানের শুরুতে নেওয়া এসব উদ্যোগ শুধু প্রাথমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে ভবিষ্যতেও ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হবে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ইউনিয়নের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, পৌর এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বাজারের যানজট নিরসন, ভেজালবিরোধী অভিযান এবং সাধারণ মানুষের ভূমিসংক্রান্ত সমস্যার আইনানুগ সমাধানে প্রশাসনের আরও কার্যকর ভূমিকা থাকবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একটি এলাকার উন্নয়ন শুধু অবকাঠামোগত কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করে না; বরং প্রশাসনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দায়িত্বশীলতা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি আন্তরিকতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন দায়িত্বশীল প্রশাসনিক কর্মকর্তার উদ্যোগ ও আন্তরিক প্রচেষ্টা স্থানীয় উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
সব মিলিয়ে যোগদানের অল্প সময়ের মধ্যেই ইউএনও রেকসোনা খাতুনের বিভিন্ন জনসেবামূলক উদ্যোগ হোসেনপুরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তিনি তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাবেন এবং হোসেনপুরের সার্বিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।